গগনকে মানায় রাজার পার্টে - এই কথা বলতেন রবীন্দ্রনাথ । রবীন্দ্রনাথের অনেক নাটকের তো রাজা আছেন - গগনেন্দ্রনাথ তাই সাজতেন । যখন রাজার পার্ট পাওয়া যেত না অথচ গগনেন্দ্রনাথকে নামাতে হবে, তখনই হত মুশকিল । যেমন একবার হয়েছিল শারদোৎসব নিয়ে । রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের দলবল নিয়ে জোড়াসাঁকোয় এসেছেন শারদোৎসব অভিনয় করতে । এসে মনে পড়েছে ভাইপোদের কথা । গগনকে শারদোৎসবের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে । শারদোৎসবে একজন রাজ চক্রবর্তী আছেন বটে কিন্তু তিনি তো ছদ্মবেশে আছেন সন্ন্যাসী সেজে । ওতে গগনেন্দ্রনাথকে মানাবে না । কাজেই লিখতে হল এক আসল রাজার পার্ট । বড় দাদামশায় গগনেন্দ্রনাথ সাজলেন রাজা, মেজদাদামশায় সমরেন্দ্রনাথ সাজলেন মন্ত্রী । স্টেজে নেমে বড় দাদা মশাই সত্যিকারের রাজা হয়ে যেতেন । সাজে-পোশাকে, চেহারায়, গলার স্বরে, দেহ বিক্ষেপে, বাহু ভঙ্গিতে কী যে হয়ে যেতেন আমরা আর চিনতে পারতুম না । মনে হত না অভিনয় করছেন । হাত পা ছুঁড়ে, গলা কাঁপিয়ে, দর্শকদের মন স্পর্শ করে বড় অভিনেতা অভিনেত্রী তো অভিনয় করে যান দেখি, কিন্তু সেই ছেলেবেলায় দেখা বড় দাদামশায়ের রাজার পার্ট যেমন মনের মধ্যে এখনও গেঁথে আছে, এমন তো কখনটি হল না ।
জোড়াসাঁকোর বাড়িতে জন্মেছিলেন সমরেন্দ্র গগনেন্দ্র অবনীন্দ্রনাথ । এই তিন ভাই যখন জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ি আলো করে থাকতেন তখন সেখানে নানা জ্ঞানীগুণী শিল্পী লেখক দেশ-বিদেশ থেকে সমাগত হতেন । ছাত্র এবং ভক্তেরা হাতের কাজ দেখতে মৌচাকের পাশে মৌমাছির মতো ভিড় করে আসতেন । শোনা যায় অবনীন্দ্রনাথ যখন ইউরোপীয় শিক্ষকের কাছে ছবি লেখার প্রথম পাঠ নিচ্ছিলেন, তখন এক উত্তরের ঘরে তুলি রং বোর্ড সাজিয়ে ইউরোপীয় প্রথা অনুযায়ী “নর্থ লাইটে” ছবি লেখার চর্চা শুরু করেছিলেন । কিছুদিনের মধ্যেই বুঝলেন, এদেশে ও সব নিরর্থক । চওড়া চৌকিতে পা গুটিয়ে বসলেন দক্ষিণের বারান্দায় । কোথায় গেল নর্থ লাইট । ফুরফুরে দক্ষিণের হাওয়া খেতে খেতে চলল ছবি আঁকা আর সেই সঙ্গে আলোচনা গল্প হাসি । মুখ বুজে কাজ করতেন না কেউ, দাদামশায়ও নন, বড় দাদা মশায়ও নন ।